সুন্দরবনে ডুবন্ত কয়লাবাহী জাহাজে পরিবেশ জীব-বৈচিত্রের ক্ষতির শংকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

সুন্দরবনে ডুবে যাওয়া কয়লা বোঝাই কার্গো জাহাটিকে পুরোপুরি উদ্ধাওে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কয়লার জাহাজ ডুবির পর দুই সপ্তাহ পার হলেও এখনও জাহাজটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এটিতে ইতিমধ্যে তিনটি ফাঁটল খুঁজে পেয়েছেন ডুবুরিরা। কয়লা তোলার সময় ডুবুরিরা এসব ফাঁটল খুঁজে পান বলে জানা গেছে।
এদিকে উদ্ধারকারীরা জানান, বর্তমানে কয়লা তোলার কাজ চলছে। দুই এক দিনের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে। এরপর জাহাজটি উদ্ধারের জন্য কাজ শুরু করা হবে। এর জন্য আরো অন্তত ২০ দিন সময় লাগতে পারে। ডুবুরিরা জানান, এ ব্যাপারে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে অবহিত করে সময় চাওয়া হবে।
অপরদিকে, দীর্ঘমেয়াদী কয়লা পানিতে ভিজে থাকার কারণে এর ক্ষতিকারক পদার্থ ইতোমধ্যে পানিতে মিশে গেছে। এতে অঙ্কুরোদগম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ মাছের শরীর থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশের আশঙ্কা করছেন গবেষকরা। গত ১৪ এপ্রিল রাতে মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলের সুন্দরবনের অভ্যন্তরের হারবাড়িয়া এলাকায় ৭৭৫ টন কয়লা নিয়ে এমভি বিলাস নামে একটি কার্গো জাহাজটি ডুবে যায়। এ ঘটনার পর বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার বিভাগ জাহাজটি উদ্ধারে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেয়। এদিকে, ডুবে যাওয়া লাইটার জাহাজ এমভি বিলাস’র মালিক ঢাকার ব্যবসায়ী মো. সোহেল। তিনি অসুস্থ থাকায় তার পরিবর্তে জাহাজটি উদ্ধারের তদারকি চালাচ্ছেন বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মো. বাহারুল ইসলাম বাহার।
কয়লা ও কার্গো উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি নৌযান শ্রমিক নেতা মো. বাহারুল ইসলাম বাহার বলেন, সুন্দরবনে কয়লার জাহাজ ডুবির পর শনিবার পর্যন্ত ১৫ দিন পার হয়েছে। তবে এখন কয়লা উত্তোলনের কাজ চলছে। এরপর জাহাজ উত্তোলনে কাজ শুরু হবে। তিনি বলেন, এখনও অন্তত ২০ দিন সময় লাগবে পুরো কাজ শেষ হতে। তবে এর আগেই বন্দরের বেঁধে দেওয়া ১৫ দিন সময় শেষ হচ্ছে। তাই আরো ২০ দিন সময় চেয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত আবেদন করা হবে। তিনি আরো জানান, ডুবন্ত কয়লার জাহাজ এমভি বিলাসের গায়ে তিনটি ফাঁটল পেয়েছে ডুবুরিরা। পাম্পের সাহায্যে ডুবন্ত জাহাজ থেকে এখন মাটি পানি মিশ্রিত কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। পরে ৪০০ টন ধারণ ক্ষমতার একটি বাল্কহেডে রাখা হচ্ছে সেই মিশ্রণ। এ পর্যায়ে ৭৭৫ টন কয়লার দুই তৃতীয়াংশ উত্তোলন সম্ভব হবে। এরপর জাহাজ উদ্ধারের কাজ শুরু হবে। পুরো জাহাজটি টেনে তোলার চেষ্টা চালানো হবে। তা সম্ভব না হলে কেটে তোলা হবে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার মো. ওয়ালিউল্লাহ বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ডুবন্ত জাহাজটির কর্তৃপক্ষকে উদ্ধারের জন্য ১৫ দিন সময় বেঁধে দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছিল। সে সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখন সময় বৃদ্ধিও আবেদন করলে তা বিবেচনা করা হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, এসব কয়লা পানিতে ভিজে থাকার কারণে ক্ষতিকারক পদার্থ পানিতে ইতোমধ্যে মিশে গেছে। কয়লা জাহাজটি যে স্থানে ডুবেছে সেখানে ইরাবতী ডলফিনের বিচরণ ক্ষেত্র। কুমিরের প্রজননেরও সময় এটা। ফলে কয়লার বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণে ডলফিন ও কুমিরের জীবনচক্র ব্যাহত হতে পারে।
সুন্দরবন নিয়ে গবেষণাকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ড্রেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, মানবসৃষ্ট দুর্যোগ ঠেকাতে হবে। কয়লাসহ কার্গোডুবি প্রাকৃতিক নয়, মানবসৃষ্ট। এ ধরনের বিপদ সুন্দরবনের পিছু ছাড়ছে না। তিনি বলেন, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা শর্ত মানছেন না। শর্তগুলো পালন হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষেরও মনিটরিং নেই।
এদিকে, হাড়বাড়িয়ায় কয়লাসহ কার্গোডুবির ঘটনায় ১৯ এপ্রিল বিভাগীয় কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রাথমিক একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি। তবে সেই প্রতিবেদনে সুন্দরবন ও এর আশপাশের পরিবেশ ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্রের ওপর এর প্রভাব নিয়ে কিছু বলা হয়নি। কার্গো উদ্ধার হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শাহিন কবির।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, বনবিভাগের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ হয়নি। তবে কয়লার রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ওই এলাকার পানি সংগ্রহ করা হয়েছে। কয়েক ধাপে সংগ্রহ করা ও পরীক্ষার মাধ্যমে পানির তারতম্য বের করার চেষ্টা চলছে।

আপনার মতামত



close