হাতিরঝিলে নায়ের লড়াই

টাইগার নিউজ

image-25915 (1)‘নাও ছাড়িয়া দে পাল উড়াইয়া দে/ ছল ছলাইয়া চলুক রে নাও /মাঝ দইরা দিয়া চলুক /মাঝ দইরা দিয়া।’

এই রকম নদীমাতৃক প্রাণ ছুয়ে যাওয়া গান গ্রাম বাংলার বুকে অনেক জনপ্রিয়। গ্রাম গঞ্জের মানুষের সঙ্গে নদীর মিতালী গভীর। একসময় নদী পথই ছিলো মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। মাঝিরা সারা রাত কুপি জ্বালিয়ে নদীতে মাছ ধরতো। পালতোলা নৌকা চালিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যেত। মেলা পার্বণ, গঞ্জের বাজার সবই বসতো নদীর তীরে।

গ্রামের মানুষের আনন্দ বিনোদনের উপকরণ বলতে ছিলো গঞ্জের মেলা, নৌকা বাইচ, হাডুডু খেলা, বাঁদর খেলা, সাপ-বেঁজীর খেলা, ঢেঁকি ঘরে ধানভানা আর কুঁড়া কোটার গান, মাঝির গলায় জারি-সারি-মুর্শিদি, ভাটিয়ালী গান, যাত্রা-পালা, নবান্ন উৎসব, বিয়ের গান প্রভৃতি। এখন সে সবই হারিয়ে যেতে বসেছে।

সেই আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য নৌকা বাইচ হলো রাজধানী ঢাকার হাতিরঝিল লেকে। ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে দুপুরে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ রোইং ফেডারেশন ও জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের সহযোগিতায় এ আয়োজন করা হয়।

৪৬ তম স্বাধীনতা দিবস নৌকা বাইচ ২০১৭ প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পুরুষদের ১০টি ও মহিলাদের ৫টি দল অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে ছিলো-মাঝি মাল্লা সমিতি, শাহীন বাগ, সৃজনী, নিউ গাজী, উত্তরা, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, উত্তরখান ও ইউনিভার্সেল রোইং ক্লাব। মেয়েদের দলগুলো হলো-নর্থ বেঙ্গল, শুভাড্ডা ইউনিয়ন, টঙ্গী ও ইউনিভার্সেল রোইং ক্লাব।

বেলা ৩টায় পুরুষের ভিন্ন ভিন্ন দল ভিন্ন ভিন্ন রঙের গেঞ্জি ও হাফপ্যান্ট পরে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। আর নারী দলও ভিন্ন ভিন্ন রঙের পোশাক পরে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। প্রতি দলে ১০ জন মাঝি ও একজন নৌকার হাল ধরা বা দাড় টানার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কেউ কেউ আবার উৎসাহ দেবার জন্য বাদ্যযন্ত্র বাজাতে থাকেন।

বাঁশি পড়ার সাথে সঙ্গে সরু নৌকার লেকের মাঝে বাধা অনেকগুলো বল বাধা দড়ির সীমারেখায় পৌঁছানোর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা শুরু হয়। এসময় লেকের দুধারে দর্শনার্থীরা মুহুমুহু করতালিতে ফেটে পড়েন। আর মাইকে প্রচার হতে থাকে প্রাণোদ্দীপক প্রচারণা।

এই প্রতিযোগিতা ঢাকা বিভাগীয় তথা আরও বৃহৎ অর্থে পুরো দেশের সাধারণ মানুষের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়, যেখানে বয়স, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ সমবেত হয়ে বিপুল আনন্দে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন।

স্বাধীনতা দিবস নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় পুরুষ দলগুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে নিউ গাজী রোইং ক্লাব এবং দ্বিতীয় হয় নিউ ইয়ং স্টার রোইং ক্লাব। আর তৃতীয় হয় ইউনির্ভাসেল রোইং ক্লাব। অপরদিকে মহিলা দলগুলোর মধ্যে প্রথম হয় শুভাড্ডা রোইং ক্লাব, দ্বিতীয় নর্থ বেঙ্গল রোইং ক্লাব এবং আলীনগর রোইং ক্লাব তৃতীয় স্থান অধিকার করে।

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এ নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন্দ্র শিকদার।

এসময় তিনি মহান স্বাধীনতা দিবসে হাতিরঝিলে ভিন্নধর্মী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা আয়োজন করে রাজধানীবাসীকে আনন্দ দেয়ায় রোইং ক্লাবকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। এভাবে চূড়ান্ত নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার পরিসমাপ্তি হয়।

বাংলাদেশ রোইং ফেডারেশনের উদ্যোগে ৪৬ তম মহান স্বাধীনতা দিবস নৌকা বাইচ এর জাকজমক এই আয়োজনে আরো উপস্থিত ছিলেন রোইং ফেডারেশনের সভাপতি হাজী মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাওছার। নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় তিনিও বিজয়ীদের পুরস্কৃত করেছেন। এসময় বাংলাদেশ রেইং ফেডারেশনের অন্যান্য কর্তৃপক্ষ উপস্থিত ছিলেন।

এসময় নৌ পুলিশ বাহিনী নিরপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক তৎপর থাকতে দেখা যায়। এছাড়া ভরদুপুরে দুরন্ত কিশোরের দল লেকের পানিতে উদোম গায়ে লাফঝাফ দিয়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে। গাড়ির টিউব ফুলিয়ে আবার কেউ শোলায় ভেসে সাঁতার কাটতে দেখা যায়। কোনো শিশু কিশোর লেকের ধারে নীল আকাশে মনে সুখে রঙিন ঘুড়ি উড়াতে থাকে। তার সঙ্গে নৌকা বাইচকে ঘিরে সুসজ্জিত ব্যান্ড বাদক দল বাজনা বাজিয়ে বাড়তি আনন্দ দেয়।

 সূত্র : ঢাকাটাইমস

আপনার মতামত



close