গুলশানে নিরাপত্তার স্বস্তি ও বিড়ম্বনা

টাইগার নিউজ

gulsan_129307রাজধানীর গুলশান-২ এর ৫১ নম্বর সড়ক। দুজন পুলিশ সদস্য সশস্ত্র পাহারায়। সময় তখন দুপুর গড়িয়ে বেলা তিনটা। এরই মধ্যে পালাবদল শেষে নতুন দুজন পুলিশ সদস্য এসে দায়িত্ব নিলেন। গুলশানের প্রতিটি সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ ভবনের সামনে এভাবেই পালা করে দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ। সেই সঙ্গে প্রতিটি সড়কে কিছুক্ষণ পর পর দেখা মেলে পুলিশের টহল দল।

গুলশানের আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার ঘটনা পর ঢাকার এই কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তার জন্য নেয়া হয়েছে আরো নানা ব্যবস্থা। বেশ কিছু সড়কে বসানো হয়েছে অতিরিক্ত তল্লাশি চৌকি। নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে যানবাহন চলাচল। পুলিশ, আর্মড পুলিশ, কূটনৈতিক নিরাপত্তা পুলিশসহ সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন সহস্রাধিক পুলিশ।

এমনকি আবাসিক এলাকার অনেক সড়কের প্রবেশমুখে বাঁশ দিয়ে প্রতিবন্ধক স্থাপন করে ওই সড়কে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে যানবাহন চলাচল। সেসব সড়কে লোকজনকে চলাচল করতে হয়ে হেঁটে। অথবা নানা পথ ঘুরে যেতে হয় বাসায় কিংবা অফিসে। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন নিকেতনের চার নম্বর গেটটি যেমন। পথটি বন্ধ করে দিয়ে সেখানে পকেট গেট দিয়ে মানুষের চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

গুলশান এলাকায় আগে থেকেই নিরাপত্তাব্যবস্থার কড়াকড়ি ছিল। আর্টিজান ট্র্যাজেডির পর নিরাপত্তা বলয় আরো বৃদ্ধি ও শক্তিশালী করা হয়েছে নানাভাবে। বিভিন্ন সড়কের ১৬টি চেকপোস্ট থেকে কড়া নজর রাখছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সন্দেহ হলে গাড়ি থামিয়ে করা হয় তল্লাশি।

এসব আয়োজনসহ সিসি ক্যামেরা চোখ দিয়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয় ঘিরে আছে কূটনৈতিক এলাকা হিসেবে পরিচিত রাজধানীর গুলশান।

এই কড়াকড়ি তৈরির প্রেক্ষাপট গুলশানের স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ হলি আর্টিজান হামলা। গত ১ জুলাই রাতে আর্টিজানে ঘটে স্মরণকালের ভয়াবহতম জঙ্গি হামলা। দুই পুলিশ কর্মকর্তা, ১৭ বিদেশিসহ ২২ জনকে খুন করে জঙ্গিরা। পরদিন ভোরে সেনাবাহিনীর অভিযানে মারা যায় পাঁচ জঙ্গি। ওই রেস্তোরাঁর প্রধান বাবুর্চির লাশও পাওয়া যায় সেখানে। এই জঙ্গি হামলার ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে গুলশানের নিরাপত্তা নিয়ে। এরপর কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নেয়া হয় পুরো এলাকা।

নিরাপত্তার এই কড়াকড়ি নাগরিকদের যতটুকু স্বস্তি দেয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে বেশি বিড়ম্বনার কারণ হচ্ছে। ওই এলাকায় এখন কেউ ঢুকতে গেলে তাকে পদে পদে পড়তে হয় নিরাপত্তা তল্লাশির মুখে। যানবাহনের অভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথে কাটছে সাধারণ যাত্রীদের সময়।

বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো

এমন নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেই ৬ সেপ্টেম্বর গুলশান ১ নম্বর গোল চত্বরের ৫১ নম্বর ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান লুট করে দুর্বৃত্তরা। ওই ভবনে সন্দেহভাজনদের ঢুকে পড়ার খবর জানাজানি হলে শুরু হয় তোলপাড়। পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলে তল্লাশি চালায় সেখানে। ওই ভবন থেকে সন্দেহভাজনদের ফেলে যাওয়া দুটি ব্যাগ পাওয়ার খবরে ছড়িয়ে পড়ে উৎকণ্ঠা। পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল তল্লাশি করে ব্যাগ দুটি থেকে ১৭টি মোবাইল ফোন আর কিছু যন্ত্রপাতি উদ্ধার করে মাত্র।

পরে জানা যায়, চার যুবক গুলশানের ওই ভবনের পেছন দিকের জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে ঢোকে এবং পরে নির্বিঘ্নে বেরিয়েও যায়। চারদিকে এত নজরদারি ওই যুবকদের ঠেকাতে পারেনি। হলি আর্টিজানের তাজা আতঙ্কের মধ্যে এ ঘটনায় অনেকে তখন প্রশ্ন তোলেন গুলশানের নিরাপত্তা নিয়ে। ওই যুবকেরা চোর না হয়ে জঙ্গি হলে ঘটতে পারত আরেকটি হলি আর্টিজান। তাহলে কি এখনো গুলশান ‘অরক্ষিত’ রয়ে গেছে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকায় নিরাপত্তা দায়িত্বে নিয়োজিত এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘ভাই, আমরা এখানে দুজন দায়িত্ব পালন করছি। হলি আর্টিজানের মতো হামলা হলে আমরা কতটুকু আর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারব!’ তবে এই নিরাপত্তার কারণে জঙ্গিরা আক্রমণের আগে এক ধরনের মানসিক বাধার মুখে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।

আগে ওই এলাকার (গুলশান) নিরাপত্তায় পুলিশ ছিল ৫০০। কিন্তু এখন দুই হাজারের বেশি পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে গুলশানে।

উচ্ছেদ অভিযানে ভাটা

গুলশান হামলার পর এই আবাসিক এলাকার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত হরা হয়েছিল। এরপর এই আবাসিক এলাকা থেকে সব ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদে নেমেছিল রাজউক। প্রথম দিকে যত তোড়জোড় দেখা গেছে, এখন আর সেটি নেই।

রাজউকের একটি সূত্র জানায়, গুলশানে এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের সঙ্গে জড়িত দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ফলে এই উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন।

এ ছাড়া এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়োজিত। হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। এলাকার মানুষের প্রাত্যহিক চাহিদাও এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। নিরাপত্তার কড়াকড়ি করতে গিয়ে হুমকিতেিএসব প্রতিষ্ঠান।

যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, যাত্রী দুর্ভোগ

নিরাপত্তার কথা বলে এই এলাকায় সব ধরনের বাস ও লেগুনা সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। পুলিশ যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে অনেক সড়কে। এমনকি কোথাও কোথাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে গাড়ি চলাচল। এতে অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়েছে যাত্রী ও এলাকার মানষজন।

কয়েকটি সড়কে গাড়ি প্রবেশ বন্ধ করে দেয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের বাসায় যেতে হয় বিভিন্ন পথ ঘুরে। অথবা অন্য কোথাও গাড়ি রেখে হেঁটে ফিরতে হয় বাসায়।

যাত্রী পরিবহনের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ‘ঢাকা চাকা’ নামে যে বাস নামিয়েছে গুলশানের রাস্তায়, তা পাওয়া যেন সোনার হরিণ। হলুদ রঙের রিকশা চাহিদার তুলনায় অপর‌্যাপ্ত। ফলে গুলশান এলাকায় সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গী এখন নিত্যদুর্ভোগ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান জোন সূত্রে জানা যায়, ৪৬টি দূতাবাস থাকা গুলশান ও বারিধারার কূটনৈতিক জোনের নিরাপত্তায় ডিপ্লোমেটিক পুলিশের ৫৭৪ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিনিয়ত মোবাইল টিম ও মোটরসাইকেল টিম ওই এলাকার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। প্রয়োজন অনুসারে চেকপোস্টের স্থানও পরিবর্তন হচ্ছে।

গুলশান ও বারিধারার দুই শতাধিক স্পটকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়। ১৬টি চেকপোস্টে তল্লাশি চালানো হচ্ছে ২৪ ঘণ্টা।

এ ছাড়া গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকায় ৫৪২টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। এসব ক্যামেরা ফেস ডিটেকশন, গাড়ির অটো নম্বর প্লেট ডিটেকশন করতে পারে।

জানতে চাইলে গুলশান জোনের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মানষ কুমার পোদ্দার ঢাকাটাইমসকে বলেন, ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশনা অনুযায়ী গুলশান এলাকায় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। হলি আর্টিজানে হামলার পর এই এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

সূত্র : ঢাকাটাইমস

আপনার মতামত



close