প্রতিনিয়ত স্প্লিন্টারের অসহনীয় যন্ত্রণা সইছি

টাইগার নিউজ

shahan_21 august_124796_0‘কয়েক দিন পর পর জ্বর আসে। হঠাৎ হঠাৎ শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুচ্চমকের মতো যন্ত্রণা নাড়া দেয়। রোদে গেলে গা চুলকায়। মাঝে মাঝে শরীর অবশ হয়ে পড়ে। সারা শরীরে যত দাগ আছে, সবই স্প্লিন্টারের। অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে কয়েক দিন পর পর চিকিৎসকের কাছে দৌড়াই। খানিক সময়ের জন্যও একটু ভালো থাকি না, শুধু দুঃসহ যন্ত্রণা!’

বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার শিকার অ্যাডভোকেট কাজী শাহানারা ইয়াসমিন এভাবেই দিন যাপন করছেন এক যুগ ধরে। এই যন্ত্রণার কবে শেষ হবে, সেই আশার বাণী কেউ শোনাতে পারছে না তাকে। শরীরে গেঁথে থাকা স্প্লিন্টারের অসহ যন্ত্রণা তার নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজ ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ১২তম বার্ষিকী। গ্রেনেড হামলার যুগপূর্তিতে তার সঙ্গে কথা হয় ঢাকাটাইমসের। শনিবার রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বিপরীত পাশে আউটার সার্কুলার রোডের নিজ বাসভবনে এই প্রতিবেদকের কাছে সতুলে ধরেন সেদিনের বিভীষিকা কথা।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গেঁথে যাওয়া ১৩৪টি স্প্লিন্টার এখন বয়ে বেড়াচ্ছেন অ্যাডভোকেট কাজী শাহানারা ইয়াসমিন।

পেশায় আইনজীবী শাহানারা ইয়াসমিন তখন বাংলাদেশ আওয়ামী আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। হাইকোর্ট থেকে মিছিল নিয়ে সেদিন আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে যোগ দেন। তার সঙ্গে তখন ছিলেন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন।

শাহানারা বলেন, ‘সেদিন নয়টার দিকে কোর্টে যাই। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে সাহারা খাতুনসহ অন্যান্য নেতার সঙ্গে আমরা বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে যাই। তৎকালীন খালেদা জিয়া সরকার ঢাকা শহরের কোথাও সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ করার অনুমতি দেয়নি বলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের পূর্বাংশে ট্রাকের ওপর স্টেজ করে সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ করে আওয়ামী লীগ।”

সেদিনের বিভীষিকার বর্ণনা দিতে গিয়ে শাহানারা ইয়াসমিন বলেন, “নেত্রীর বক্তব্যের শেষে সাংবাদিক গোর্কি ভাই এসে নেত্রীকে বলল, ‘আপা আমি ছাবি নিতে পারি নাই।’ সে দু-তিনটা ছবি নিতেই হঠাৎ বিকট শব্দে গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়। প্রথম গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয় আইভি আপার পায়ের কাছে। দেখলাম আইভি আপা পানিতে যেমন ডুবে যায় সেভাবে বসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে সাদা ও কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠতে লাগল। এরপর অনুভব করতে লাগলাম আমার ডান পা জ্বলে উঠছে। পা টানতে পারছি না। পরপর বিকট শব্দে কয়েকটি গ্রেনেড বিস্ফোরন হওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পা ছেচড়িয়ে কিছুদূর এগিয়ে যেতেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলি। তার আগে শুধু পর পর কয়েকটি শব্দ শুনেছি।

“জ্ঞান ফিরলে দেখি তিনজনে আমাকে ধরাধরি করে বাটার গলির ভেতর নিয়ে যায়। তখন তারা বলছে, কাঁদানে গ্যাস ও গুলি হচ্ছে। এখন হাসপাতালে নেওয়া যাবে না। এরপর গোলাগুলি থেমে গেলে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজে, তারপর সিকদার মেডিকেল চিকিৎসা হয় আমার। এর কয়েক দিন পর শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে ৩৪ জনকে কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। বাংলাদেশ ও কলকাতার হাসপাতাল মিলে মোট ৪৬ দিন চিকিৎসা নিই আমরা।”

কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি শাহানারা ইয়াসমিনসহ সঅনেকে। শাহানারা বলেন, ‘এখনো আমার শরীরে ১৩৪টি স্প্লিন্টার বিঁধে আছে। মাঝেমধ্যে মৃত্যুযন্ত্রণা দেয় এগুলো। যখন ব্যথা হয়, তখন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না। ওষুধ বন্ধ করলেই সেগুলো মাথা চাড়া দেয়। ডান পায়ের গোড়ালিতে দুটি স্প্লিন্টার এবং বাঁ পায়ের গোড়ালিতে একটি বিঁধে আছে। সেগুলো অনেক ফুলে গেছে।’

এক যুগে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার শেষ না হওয়ায় মনটা মাঝে মাঝে খারাপ হয় আওয়ামী মহিলা আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতি শাহানারা ইয়াসমিনের। তবে তিনি আশাবাদী দ্রুতই নিষ্পত্তি হবে এই মামলার।

গ্রেনেড হামলা মামলার একজন সাক্ষী তিনি নিজেও। বলেন, ‘এই মামলায় ২২৪ জনের মধ্যে ১৫২ নম্বর সাক্ষী আমি। মামলার সব কার্যক্রম শেষের দিকে। আশা করি, যে ২৪ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন, তারাসহ সবাই ন্যায়বিচার পাবেন। আর এর মধ্য দিয়ে শান্তি পাবে নিহতদের আত্মা।’

সূত্র : ঢাকাটাইমস

আপনার মতামত



close