বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার: সরকারের ব্যর্থতাও কম না

টাইগার নিউজ

 

razual_1_124089বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচার করতে বারবার বাধা দেয়া হয়েছে। তৎকালীন ডিআইজি প্রিজনের উদ্যোগেই মূলত বঙ্গবন্ধু মামলাটি প্রাথমিকভাবে শুরু হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বাধা সৃষ্টির কারণে আর অগ্রসর হয়নি। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ইমডেনিটি বিল (বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দায়মুক্তি দিয়ে আনা বিল) বাতিল করে। সেই আদেশের বিরুদ্ধে খুনিদের পক্ষ থেকে রিট করা হয়। দীর্ঘ শুনানির পর আপিল বিভাগ ইনডেমনিটি বিল বাতিল সঠিক বলার পর বিচারের পথ খুলে যায়।

এরপর প্রথম যে এফআইআরটি হয়েছিল সেটাকেই ভিত্তি করেই তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল কাহহার আকন্দ। এরপরও আসামিরা কয়েক দফায় মামলাটির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যান। একটার শুনানি শেষ হয় আবার হাইকোর্টে তোলা হয় নতুন আবেদন।

সাক্ষীদের জেরা চলাকালেও বারবার হাইকোর্টে যায় আসামিরা। নিস্পত্তির পর আবার নতুন বিষয় নিয়ে আসে আসামিপক্ষ। এভাবে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক হাইকোর্ট-জজকোট চলতে থাকে। এক পর্যায় ঢাকার তৎকালীন দায়রা জজ কাজী গোলাম রসূল রায় ঘোষণা করলেন। তিনি তাহের উদ্দিন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনসহ কয়েকজনকে অব্যাহতি দিয়ে অন্যদেরকে মৃত্যুদ- দিলেন।

মৃত্যুদ-প্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্সের শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসলো। এরপর দীর্ঘ দিন শুনানি হচ্ছিল না। পরে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এম রুহুল আমিনের বেঞ্চ শুনানি করলেন। দুইজন আবার দ্বিধাবিভক্ত রায় ঘোষণা করলেন। খায়রুল হক বিচারিক আদালতে দ- পাওয়া সবার মৃত্যুদ- বহাল রাখলেন। কিন্তু রুহুল আমিন কয়েকজনকে খালাস দিলেন। এরপর মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে গেল। তিনি মামলাটি বিচারপতি ফজলুল করিমের একক বেঞ্চ দিলেন। তিনি ১২ জনের মৃত্যুদ- বহাল রাখলেন।

এরপর মামলাটি গেলো আপিল বিভাগে। সেখানে শুনানির জন্য যে বেঞ্চ দরকার সেই বেঞ্চ আর পাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ ওই বিভাগের কোনো কোনো বিচারক হাইকোর্টের শুনানিতে ছিলেন। ফলে তারা এটা শুনতে পারতেন না। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী তার বিদায়ী ভাষণে বলছিলেন যে, ‘আমি বারবার সরকারকে (চারদলীয় জোট সরকার) অনুরোধ করেছিলাম, যে আমাকে এডহক ভিত্তিতে দুইজন বিচারক দেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাটার বিচার করি। কিন্তু আমাকে দেয়া হয়নি।’

আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পরে আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ হলে মামলাটি নিষ্পত্তি হলো। আর যারা কারাগারে ছিলেন তাদের মৃত্যুদ- কার্যকর হয়।

রাজনৈতিক কারণে এই মামলাটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তার শিশু, পুত্র, পুত্রবধু, তার স্ত্রী ও অন্যদেরকে হত্যা করা হলো। এটাই স্বাভাবিক যে এর বিচার হবে। কিন্তু হত্যার পর পর বিচার যেন না হয় সেজন্য অধ্যাদেশ জারি করেন সামরিক আইন প্রশাসক মোশতাক আহমেদ। তখন উপ সামরিক আইন প্রসাশক ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। তারা কেবল এই ঘটনার বিচারই আটকে দিলেন না, ফারুক, রশিদ, শাহরিয়ারসহ খুনিদেরকে চাকরিও দেন। তাদেরকে সরকারি টাকায় বিমানে করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে নিয়োগও দেয়া হয়।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে সংসদে এই অধ্যাদেশকে সংবিধানের অংশ করে দিলেন। পরে খুনি ফারুককে বিরোধীদলীয় নেতাও করা হলো সংসদে।

খুনিদের দুটি দল ছিল, একটা হলো প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি, অন্যটা ছিল ফ্রিডম পার্টি। তারা এরশাদের আমলে একবার সংসদে আসলো, আরেকবার আসলো খালেদা জিয়ার আমলে। দুইবার দুইটা নির্বাচনে তারা অংশ নেয়ার সুযোগ পেল। তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষাও দেয়া হল।

ধারাবাহিকভাবে যদি বিবেচনা করা হয় দেখা যাবে, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না হওয়া আদালতের যতটা অনীহা বা টেকনিক্যাল কারণে হয়েছিল তার চেয়ে বেশি হয়েছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে বিচারকদের বারবার বিব্রতবোধ করা এবং আপিল বিভাগে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতি নিয়োগ না দেয়া এটাও ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

বিচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষেরও অনেক ব্যর্থতা রয়েছে। বিচারিক আদালত তাহের উদ্দিন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম, কেএম ওবায়দুর রহমানসহ কয়েকজনকে খালাস দিলেও রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরুদ্ধে আপিল করেনি। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী এ বি এম বায়েজিদ রিভিশন দায়ের করলেও তাকে তখন চাপ প্রয়োগ করে আবেদনটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়।

হাইকোর্টের একক বেঞ্চ যখন দুইজনের মৃত্যুদ- বাদ দিল তখনও এর বিরুদ্ধে আপিল করা উচিৎ ছিল। আরেকটি ব্যর্থতা হলো বঙ্গবন্ধুর খুনিদেরকেই কেবল বিচার করা হয়েছিল। যারা ষড়যন্ত্রে জড়িত তাদেরকে আজও বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।

কর্নেল ফারুক গ্রানাডা টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তারা অপারেশনের আগে জিয়াউর রহমানের কাছে গেছেন। জিয়াউর রহমান তাদেরকে বলেন, ‘যদি তোমরা সাকসেসফুল হয়ে আসতে পার, আমি তোমাদেরকে ওয়েলকাম করবো।’ ফারুক বলেছেন, জিয়াউর রহমানের সবুক সংকেত পেয়েই তারা অপারেশনে গেছেন। আবার বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কিছু সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে যখন খবরটা দেন তখন তিনি বলেন, ‘সো ওয়ার্ট, রাষ্ট্রপতি নাই, উপ রাষ্ট্রপতিতো আছে।’

ক্ষমতায় থাকাকালে জিয়াউর রহমান খুনিদের চাকরি দিয়েছেন। খুনিদের রাজনৈতিক দল গঠন করতেও দিয়েছিলেন তিনিই। শুধু জিয়াউর রহমান না, আমি মনে করি সেনাবাহিনীর ভেতরেরও কেউ কেউ জড়িত ছিল। অনেক বেসামরিক ব্যক্তিও জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা মোশতাকের ডাকে সাড়া দিয়ে মন্ত্রী হয়েছেন। বর্তমান আইনমন্ত্রীর বাবা সিরাজুল হক বঙ্গভবনে গিয়ে বলেছিলেন যে, ‘আই ডোন্ট রিকোগনাইজ ইউ অ্যাস প্রেসিডেন্ট, ইউ আর কিলার।’ তখন তাকে গুলি করতে আসে সেনারা। পরে কর্নেল উসমানী তাকে রক্ষা করেন। তখন উনি ছাড়া অন্যরা সাহস দেখাতে পারেননি। ধরে নিতে হবে, এই ঘটনার বেনিফিসিয়ারি তারাও। এদের একটা অংশ পরিকল্পনায় জড়িত ছিল ধরেই নেয়া যায়।

ফৌযদারী কার্যবিধির ১৭৩ এর বি ২ ধারায় বলা আছে, কোনো মামলায় অভিযোগপত্র দেয়ার পরও যদি কোন প্রমাণ আসে, তাহলে নতুন করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দিতে কোনো বাধা নেই। ফলে আমি মনে করি নতুন করে মামলা দায়েরের দরকার নেই। নতুন করে তদন্ত শুরু করার দরকার আছে। এখনো আইনের আওতায় আনা যাবে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার রাতে শেখ ফজলুল হক মনিকে হত্যা করা হয়েছিল। তখন যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। তার স্ত্রী আরজু মনি ও এক সন্তানকেও হত্যা করা হয়েছিল। কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াত ও তার বাসার আরও কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিল। ঘটনাস্থল আলাদা হওয়ায় মামলাও হয়েছে আলাদা। এসব মামলায় তদন্ত আজও শেষ হয়নি।

বাকিদের মধ্যে কর্নেল সাফায়েত জামি হত্যা হয়েছে বাড়ির বাইরে। মোহাম্মদপুরে দুটি শেল গিয়ে পড়ে কয়েকজন লোক মারা গিয়েছিল সেটারও বিচার হয়নি। তাই বলতে পারি, বিরোধীরা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করে সফল হয়েছে। পাশাপাশি সরকারেরও ব্যর্থতা আছে।

শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য, আব্দুর রব সেরনিবায়াতের ছেলেও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা। তদের দল ক্ষমতায় থাকা সত্বেও এসব মামলার তদন্তে অগ্রগতি নেই কেন? আমরা তো বলতেই পারি, নির্লিপ্ততা, দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা পরিবারের পক্ষ থেকেও দেখানো হয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদেরকে দেশে নিয়ে এসে দ- কার্যকর। এটা সত্যিই জটিল। কারণ তারা এমন সব দেশে আছে, যেসব দেশে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামিদেরকে তারা ফিরিয়ে দেয় না। কিন্তু কানাডায় নুর চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হয়ে যাওয়ার পর তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জোড়ালভাবে কোন তৎপরতা ছিল না। সে সময় আওয়ামী লীগই কিন্তু সরকারে ছিল।

আমেরিকাও মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ব্যক্তিকে সাধারণত তাদের দেশে থাকার সুযোগ দেয়। কিন্তু কর্নেল মহিউদ্দিনকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তাহলে কানাডা থেকে নুর চৌধুরীকে আনা সম্ভব হলো না কেন? শুধু দায়সারা বিবৃতি, সাক্ষাৎকার না দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে মহিউদ্দিনকে এবং বজলুল হুদার মত কাউকে কাউকে আনা যেতই।

এখন না হয় তারা মৃত্যুদ-প্রাপ্ত। কিন্তু অভিযোগপত্র দেয়ার পর তো তারা তা ছিল না। তখন আসামিকে বিদেশ থেকে আনা সহজ ছিল। এ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র ভূমিকা রাখতে পারেনি।

লেখক: সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী

সূত্র : ঢাকাটাইমস

আপনার মতামত



close