সুন্দরবনে খাদ্য সংকটে বাঘ হানা দিচ্ছে লোকালয়ে রাত জেগে পাহারায় গ্রামবাসী

Bagerhat, Ahsan photo - 1
আহসানুল করিম, বাগেরহাট

 

27c678db-720d-49d7-b452-6a8442f59ee6ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সুন্দরবনের প্রকৃতির পাহারাদার রয়েল বেঙ্গল টাইগার এখন চরম খাদ্য সংকটে পড়েছে। খাদ্যাভাবের কারনে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ থেকে নদী সাঁতরে গভীর রাতে শরণখোলা ও মংলা উপজেলার বন সন্নিহিত লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে বাঘ। এক মাস ধরে শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে গরু-ছাগল-মহিশ, হাসঁ-মুরগী। গত ২৪ ডিসেম্বর থেকে প্রায় প্রতিদিনই লোকালয়ে হানা দিচ্ছে বাঘ। লোকালয় দুটির সর্বত্র দেখা যাচ্ছে বাঘের পায়ের তাজা ছাপ। বাগেরহাটের শরণখোলা ও মংলা উপজেলার সুন্দরবন সন্নিহিত সোনাতলা, উত্তর রাজাপুর ও বরইতলাসহ আশপাশের কয়েক গ্রামে এক মাস ধরে হানা দিচ্ছে রয়েল টাইগার। এসব গ্রামের আমজনতা বাঘের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। অনেকে আবার পরিবার-পরিজন নিয়ে ‘বাঘ মামা’র ভয়ে অন্যত্র আতিœয়-স্বজনের বড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ এতথ্য নিশ্চিত করেছে।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ ও এলাকাবাসি জানায়, এক মাস ধরে প্রতিনিয়ত গভীর রাতে শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা ফরেস্ট ক্যাম্প সংলগ্ন বন থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বগী-শরণখোলা নদী সাঁতরে সোনাতলা, চাঁদপাই রেঞ্জর নাংলী ফরেস্ট ক্যাম্প এলাকা ও মংলা উপজেলার বরইতলাসহ আশপাশের কয়েক গ্রামে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ঢুকে পড়ছে। লোকালয়ে বাঘ ঢুকে পড়ার পর থেকে শরণখোলার সোনাতলা, উত্তর রাজাপুর ও মংলা উপজেলার বরইতলাসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। শরণখোলার সুন্দরবন সন্নিহিত সোনাতলা গ্রামের আবু রাজ্জাক আকন জানান, গত ২৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে সোনাতলা ও উত্তর রাজাপুর গ্রামে দুটি বাঘ নদী সাঁতরে গ্রামে ঢুকে পড়ে। এরপর থেকে প্রায় প্রতি রাতেই গ্রাম দুটিতে রাতের আধারে খাদ্যের সন্ধানে বাঘ হানা দিচ্ছে। ইতিমধ্যে এই দুটি গ্রামের ১০ থেকে ১২টি গবাদী পশু ও হাসঁ-মুরগী ধরে নিয়ে গেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এই গ্রাম দুটির বিভিন্ন স্থানে দেখা মিলছে বাঘের পায়ের তাজা ছাপ।
মংলায় এক মাস ধরে একই অবস্থা বিরাজ করছে সুন্দরবন সংলগ্ন বরইতলাসহ আশপাশের কয়েক গ্রামে। গত এক মাস ধরে এসব গ্রামে বাঘের উৎপাত বেড়ে গেছে। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রায়ই রাতেই হানা দিচ্ছে বন সংলগ্ন লোকালয়ে। বাঘ রাতের বেলায় লোকালয়ে ঢুকে পড়ে গরু, মহিষ, কুকুর ছাগলসহ হাস-মুরগী ধরে নিয়ে যাচ্ছে। বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করলেই বন বিভাগ ফাকা গুলি ছুড়ে ও গ্রামবাসী জড়ো হয়ে বিকট শব্দের করে বাঘকে বনে তাড়িয়ে দিচ্ছে। বাঘ লোকালয়ে প্রতিনিয়ত ঢুকে পড়ায় গ্রামবাসী, বনবিভাগ ও টাইগার টিমের সদস্যরা পালাক্রমে রাতভর পাহার দিচ্ছে মাসের অধিক সময় ধরে। বাঘ আতংকে সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের রাস্তাঘাট ও বাজার লোকজন শূণ্য হয়ে যায়। সন্ধ্যার সাথে-সাথেই ঘরের দরজা বন্ধ করে সবাই অবস্থান নেয় ঘরের মধ্যে। আর বাঘের ভয়ে আতংকিত খোদ বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কারণ বাঘের উৎপাত সবচেয়ে বেশি বেড়ে গেছে বিশেষ করে বরইতলা ফরেস্ট ক্যাম্প এলাকায়। ক্যাম্পের আশপাশ দিয়ে বাঘের চলাফেরায় বনবিভাগের লোকজন ভয়ে রাত কাটাচ্ছে। আর বনবিভাগের সদস্যদের বসবাসের ঘরও খুব নাজুক। তাই বন বিভাগসহ লোকালয়ে কয়েক হাজার মানুষের বিনিদ্র রাত কাটছে। এখানকার লোকজন রাতে বেলায় ঘরের মধ্যে আলো না জ্বালিয়ে ঘরের বাইরে উঠানে বাতি জ্বালিয়ে রাখছে। যাতে বাঘ আসলে দেখা যায়।
এবিষয়ে সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে প্রকৃত পক্ষে বাঘ এখন অস্তিস্ব সংকটে পড়েছে। সর্বশেষ জরিপ মতে সুন্দরবনে এখন ১০৬টি বাঘ রয়েছে। সুন্দরবনে একর পর এক মানুষের সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়, চোরা শিকারী ও বনদস্যুদের হাতে হরিণসহ বন্যপ্রাণী লাগামহীন ভাবে শিকারের ফলে বনে বাঘের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। একারনেই খাদ্যাভাবে সুন্দরবনের বাঘ প্রতিনিয়ত লোকালয়ে এসে গবাদী পশু ও হাসঁ-মুরগী ধরে নিয়ে যাচ্ছে। অস্তিস্ব সংকটের হাত থেকে সুন্দরবনের বাঘকে বাঁচিয়ে বাখতে হলে তাদের আবাসস্থলে পর্যাপ্ত খাদ্যের নিশ্চিয়তা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই খাদ্যের সন্ধানে বাঘ লোকালয়ে আসা বন্ধ করবে।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ ও চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা ফরেষ্ট রেঞ্জার গাজী মতিয়ার রহমান জানান, সুন্দরবন থেকে রাতের আধারে লোকালয়ে বাঘ ঢুকছে এমন খবর নিশ্চিত হয়ে বনের তেড়াবেকা, ভোলা, দাসের ভারাণী, ধানসাগর, নাংলী ও বরইতলা ফরেস্ট ক্যাম্পের কর্মকর্তা, বনরক্ষী ও টাইগার রেস্পন্ট টিমসহ কো-ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। ক্যাম্পগুলোর বনরক্ষীদের নিজ নিজ এলাকা নজরদারীতে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এলাকা দুটির মসজিদ থেকে মাইকিং করে মানুষজনকে শতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে। তবে কি কারনে প্রতিনিয়ত লোকালয়ে বাঘ হানা দিচ্ছে ? সে বিষয়ে স্পর্স্ট কোন উত্তর দেননি এদুই বন কর্মকর্তা।

আপনার মতামত



close