পাঠকের মৃত্যু ঘটেছে বলেই কি দীপনের মৃত্যু?

টাইগার নিউজ
tushar abdullah-pic_90445তুষার আবদুল্লাহ

পাঠকের মৃত্যু ঘটেছে। সামষ্টিকভাবে বললে কোনো পাঠক মৃত্যুবরণ করেছেন, কোনো পাঠক আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন। পাঠকের মৃত্যু সংবাদ মেনে নিতে রাজি হবেন না কেউই। কারণ আমরা সবাই কমবেশি নিজেকে পাঠক বলে জাহির করি। আমরা মনে করি প্রতিনিয়ত পাঠের মধ্যেই আছি। প্রশ্ন হলো আমরা কি পাঠ করছি? আসলে আমরা পাঠ করছি নাকি তথ্য কুড়াচ্ছি সেটি বিবেচনার বিষয়। আবার যা পাঠ করছি সেই পাঠ পদ্ধতিগতভাবে হচ্ছে কি না।

আমাদের পাঠের রেওয়াজ হয়ে গেছে পরিসংখ্যান-নির্ভর। যার কাছে যত সংখ্যাবাচক তথ্য থাকবে, তিনিই তত জ্ঞানের ধারক বলে বিবেচিত হচ্ছেন। সমাজ, রাষ্ট্রের সংকট হলো জ্ঞানের সংজ্ঞা নির্ধারণ করার অক্ষমতা। কাকে জ্ঞানী বলে গণ্য করা হবে সেই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে সমাজ ও রাষ্ট্র। একই সঙ্গে গড্ডলিকা প্রবাহতেও গা ভাসিয়ে দেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে, যা স্পর্শ করেছে পরিবারকেও। আমরা আগে আলোচনা করে নিতে পারি পাঠক নির্মাণ নিয়ে। শিশু যখন বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত হয়, তখনই ধীরে ধীরে তার পাঠের দিগন্ত প্রসারিত হওয়ার কথা। একসময় সেই দিগন্ত ছিল অপার। এখন ক্রমশ তা সংকুচিত হয়েছে। এই সংকোচনের কাঠামো তৈরি হয়েছে পাঠ্যক্রমের মোড়কে। আমাদের নানামুখী শিক্ষা।

কোনো শিক্ষাই মান বিবেচক নয়। মূলত পরীক্ষা পদ্ধতি-নির্ভর। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সৃজনশীল জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। সংখ্যাবাচক তথ্য থাকলেই হবে। গাণিতিক ফলাফল-নির্ভর যে শিক্ষাপদ্ধতি বা নীতি সেখানে পরিসংখ্যানটিই মুখ্য। মান শিক্ষার চেয়ে কতজন উত্তীর্ণ হলো সেটিই বিবেচনার বিষয়। এই পরীক্ষা পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের কৌশলে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এখন তারা আর জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী নয়। চাকরির বাজারেও সংখ্যাবাচক শিক্ষার কদর। ফলে স্কুল থেকে পাঠ্যবইয়ে যেমন একজন শিক্ষার্থী জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হবে, তেমনি পাঠ্যসূচির বাইরের বইও তার হাতে উঠে আসবে। যেখানে নিজের ধারণার সঙ্গে অন্যের ধারণাকে মিলিয়ে নেবে সে। নিজের ধারণার সঙ্গে অপরের ধারণার দূরত্ব কতটুকু বুঝে নিতে পারবে। সবচেয়ে বড় কাজটি হলো অন্যের মতামত সইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে তার মধ্যে। অন্যের মতামতকে অশ্রদ্ধা করতে শিখবে না সে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের এই শিক্ষাক্রম যে জ্ঞানভিত্তিক পাঠ থেকে একজন শিক্ষার্থীকে সরিয়ে দিল, তার চ্যুতি ঘটল জ্ঞানের সড়ক থেকে, সেটা উচ্চশিক্ষা অবধি বিস্তৃত হলো। ফলাফল ঘটল এই জায়গাতে যে, তার উপলব্ধি দাঁড়িয়ে গেছে, সে অনেক পড়ছে। পাঠ্যপুস্তক পড়ছে, সংখ্যাবাচক তথ্য পড়ছে, তার পাঠে সে কোনো ঘাটতি দেখতে পাচ্ছে না। এর পাশাপাশি তাকে স্কুল পর্যায় থেকেই জনপ্রিয় ধারার পাঠের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই পাঠ থেকে সে ধারণা পেয়েছে বা পাচ্ছে তাৎক্ষণিক সময় সম্পর্কে। যে ধারণা থেকে সে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা শিখছে।

কোনো একটি বিষয় পাঠ করেই নিজস্ব একটি প্রতিক্রিয়া করতে অভ্যস্ত হয়েছে বটে, কিন্তু এই পাঠ তাকে ভাবতে শেখাচ্ছে না। তাৎক্ষণিক ঘটনার যে ইতিহাস আছে, আছে পরম্পরা এ কথা তার অজানা। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিকতাকে যে আবার দূরবর্তী দৃষ্টি দিয়ে দেখতে হয়, সেই বোধটিও তার ভেতর তৈরি হয়নি। ফলে গড্ডলিকার প্রবাহে তার জ্ঞান তাৎক্ষণিকতায় আটকে থাকছে। এর অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সে ভাবিত নয়। ফলে একসময় সে প্রতিক্রিয়াশীল পাঠকে পরিণত হচ্ছে। যে অন্যের মতামত গ্রহণ করতে পারে না। তার অজ্ঞাত থাকে এই তথ্যটিÑপৃথিবীতে কোনো মতবাদই চূড়ান্ত নয়।

সব মতবাদের ভিন্ন মত আছে। যখন একজন পাঠক প্রকৃত অর্থে নিজের পাঠকে ধারণা থেকে জ্ঞানের দিকে উত্তরণ ঘটাতে চাইবেন, তখনই সেই পাঠক তার ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি আর দশজনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চাইবেন। এই মিলিয়ে নিতে গিয়েই তাকে দশজনার মতামত শুনতে হবে। অন্যের মতামতের প্রতি মনোযোগী হতে গিয়েই তার মধ্যে সহিষ্ণুতা তৈরি হবে। সহিষ্ণুতার বড় গুণ সে কাউকে উগ্র চিন্তার পাঠক বা মানুষ বলে তৈরি করে না। পাঠক তৈরি হয় মুক্তমনা পাঠকে। মানুষও তাই হন মুক্তমনা। একজন মানুষের মনে তখন আরেকজন মানুষের চিন্তা বসত করার সুযোগ পায়। এভাবেই সমাজ ও রাষ্ট্রে একাধিক মতবাদ পাশাপাশি বসত করতে শেখে।

আমাদের রাষ্ট্রের বড় সংকট হচ্ছে মুক্তমনা পাঠক তৈরির প্রক্রিয়া ও এর পথ বন্ধ হয়ে গেছে প্রায়। সার্বিক পাঠ বন্ধ হয়ে গেছে। পাঠ নিয়ে চক্র বা আলোচনার ভিড় এখন আর দেখা যায় না। একজনের মতামত অন্যজন সইব না ভেবেই সবাই একক ধারণার আধার হচ্ছি। নিজেই নিজেকে বুদ্ধিজীবী বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমিক বলে দাবি করছি। কিন্তু কেউই বিবেকবান বা মুক্তচিন্তক হতে পারছি না। কারণ আমরা জ্ঞান পাঠ ভুলে সংখ্যাবাচক পাঠে মন দিয়েছি। আমাদের ক্ষমতার কাছে যেতে, শোষক হতে, দখলদার হতে এই হিসেবী শিক্ষাটাই নাকি জরুরি। অন্যের মতের সঙ্গে মত মিলিয়ে আমরা জ্ঞানের সড়ক, মহাসড়কে চলছি না।

মুক্তমনা পাঠকের মড়কের কারণেই প্রতিক্রিয়াশীল পাঠকের সংখ্যা বেড়েছে। তারা ধারণাগত জ্ঞান নিয়েই তাদের প্রতিক্রিয়া চরিতার্থ করতে চায়। ফলাফল হলো আমরা এক অপরাধের দ্বীপচরে বসতি গড়েছি। জ্ঞানের জনপদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ নেই। এই অপরাধের দ্বীপচরে এখন হত্যাই সত্য। মিথ্যে বেঁচে থাকা, মিথ্যে জ্ঞানের দ্যুতি ছড়ানো। পাঠকের মৃত্যু এই মিথ্যেকে যে প্রতিষ্ঠিত করেছে জাগৃতির প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা তারই প্রমাণ রেখে গেল।

সূত্র : ঢাকাটাইমস

আপনার মতামত



close