পুরুষরা যতদিন না পথে নামছে…হবে না

টাইগার নিউজ

11111_79983_0টাইগার নিউজ :: ফোনের ওপারে অজ্ঞাতবাস থেকে তসলিমা নাসরিন। কনফারেন্স কলে ‘নির্বাসিত’ ছবির পরিচালক চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়।‘নির্বাসিত’ নিয়ে জানিয়েছেন না বলা অনেক কথা। ভারতীয় এক পত্রিকার সৌজন্যে সাক্ষতকারের হুবহু তুলে ধরা হলো-

প্রশ্ন: অবশেষে মুক্তি পেল ‘নির্বাসিত’৷ কেমন প্রতিক্রিয়া পেলেন?

চূর্ণী: অত্যন্ত ভালো৷ ছবিটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর দর্শক চুপ করে বসেছিলেন৷ পরে অনেকে বলেছেন যে উঠে চলে যেতে ইচ্ছে করছিলো না৷ বিরতিতে অনেকে বেরোননি৷ কেউ বা হল থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন৷

তসলিমা: এটা কি লেখিকার জন্য কষ্ট না সিনেমার জন্য বিহ্বলতা? চূর্ণী: নিশ্চয়ই প্রথমটা৷ চোখের পানি তো লেখিকার কষ্টের কথা ভেবেই৷ আমার জন্য তো নয়৷

প্রশ্ন: এমন একজনের সঙ্গে কথা বলছি যিনি একজন নারী এবং যিনি নারী স্বাধীনতার কথা লিখেছেন এবং যিনি নির্বাসিত৷ কেমন একটা হাস্যকর সমাপতন না?

তসলিমা: আমরা বিদেশিদের শত্রু জ্ঞান করে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছি৷ নিজেরা দেশের হাল হাতে নিয়েছি৷ কিন্তু দেখা গিয়েছে আস্তে আস্তে আমরা নিজেরাই শাসক আর শোষক হয়ে উঠেছি৷ এই হিপোক্রিসি সর্বত্র৷ নিজেরাই নিজেদের সঙ্গে শত্রুতা করলাম৷ দেশ মানে তো নিরাপত্তা, বাক-স্বাধীনতা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার৷ দেশ যদি নারী, সৃষ্টিশীল মানুষকে নিরাপত্তা না দিতে পারে, মেয়েদের ধর্ষিত হওয়ার থেকে বাঁচাতে না পারে, তাহলে সেই দেশ কী করে স্বাধীন হয়? চূর্ণীর ছবিতে এগুলো অত স্পষ্ট করে আসেনি৷ তবে বিষয়গুলো যেভাবে চূর্ণী এনেছে- বেড়ালটা, সেই লেখিকা- জরুরি প্রশ্নগুলো ঠিকই এসেছে, স্বাধীনতা বিষয়ে, মুক্ত চিন্তা বিষয়ে৷

প্রশ্ন: আপনার প্রিয় কলকাতায় ছবির প্রিমিয়ার হল৷ আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে কত মানুষ লিখছেন যে তাঁরা ছবির প্রিমিয়ারে গিয়েছিলেন৷ আপ্লুত হয়ে ছবিটা তাঁদের ভালো লেগেছে জানিয়েছেন৷

তসলিমা: আমি তো বার বার খোঁজ নিচ্ছিলাম! কলকাতায় প্রিমিয়ার হল আর আমিই নেই সেই প্রিমিয়ারে৷ কোনওদিন ভাবতে পারিনি কলকাতা ছাড়তে হবে৷ ১৯৭৮ থেকে এই কলকাতায় আসা-যাওয়া। তারপর আমার বই নিষিদ্ধ করল, আমাকে তাড়িয়ে দিল৷ ‘নির্বাসন’ গল্পটা যে বইতে আছে সেটা কলকাতার বইমেলায় উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল৷ সেটা নিষিদ্ধ হয়ে গেল৷ সেটা তারপর উদ্বোধন করেন নবারুন ভট্টাচার্য৷ সিরিয়ালের ব্যাপারেও এক অবস্থা৷ শেষ পর্যন্ত টেলিকাস্ট হল না৷ ছবি করবে বলেও অ্যাডভান্স টাকা দিয়েছে, সই পর্যন্ত করিয়ে নিয়েছে, কিন্তু ছবিটা হয়নি৷ তাই সত্যি কথা বলতে চূর্ণী যখন ছবিটা করবে বলল, বিশ্বাস করতে পারিনি ও সত্যিই পারবে বলে৷ মানুষটাকেই তো তোমরা নিষিদ্ধ করে দিয়েছ, তার আবার ছবি!

চূর্ণী: তুমি সশরীরে ফিরতে পারলে না, ছবি হয়ে ফিরলে!

প্রশ্ন: ছবির কোন জায়গাগুলো ভালো লেগেছে?

তসলিমা: কিছু কিছু জায়গায় চোখে জল এসে গিয়েছে৷ কিছু ঘটনা হুবহু এক রেখেছে চূর্ণী৷ বিদেশে যে দ্বীপে আমি ছিলাম সেই জায়গাতেই শ্যুট করেছে৷ ওই কবিতাটা – ‘বাড়িটা তুই আছিস কেমন’ – দেখতে দেখতে মনে পড়ল ওটা দিল্লির হাউস অ্যারেস্টে নিরাপত্তার মধ্যে বসে লেখা৷ সে ভয়ঙ্কর অবস্থা৷ সেই জায়গাটা যেখানে বেড়ালটা তার মাকে খুঁজছে৷ ওই নারীকে যখন তার মা বলে ভ্রম হচ্ছে৷ অনেক ছোট ছোট কাজ মনকে নাড়া দিয়েছে৷ বা বিদেশে যখন চূর্ণী ফ্রিজ খুলে খাবার খেতে গিয়ে গন্ধে খেতে পারে না, বমি করে ফেলে- ওই অসহায়তার জায়গাগুলো৷ অথচ কী অন্যায় করেছিল মানুষটা? মেয়েদের জন্য লিখেছিল, এই তো? আমাকে অনেকে বলেছেন, ‘তোমার তো ওই বিদেশের আরামের জায়গায় সুখি হওয়ার কথা৷’ আমি তাদের কী করে বোঝাবো যে নিজের মানুষের কাছ থেকে, শেকড় ছেড়ে দূরে গিয়ে কেউ সুখি হয় না৷ ওই অবস্থায় বিদেশের মোহ কাউকে বশ করতে পারে না৷

প্রশ্ন: আপনার মিনু (বেড়াল) কেমন আছে?

পুরুষরা যতদিন না পথে নামছে…হবে না
তসলিমা: (হেসে) মিনু ভালো আছে৷ এখন আমার কাছেই আছে৷ সাড়ে তিন বছর ও কাছে ছিল না৷ কত জায়গায় ঘুরেছে৷ কখনও কখনও বাথরুমের এক ছোট্ট কোনায় বন্দী ছিল- ভাবতে পারেন! আমার মতো ও-ও লড়াই চালিয়ে গিয়েছে৷ চূর্ণী খুবই পরিচ্ছন্ন, সুন্দর করে দেখিয়েছে এই জায়গাগুলো৷ (মজা করে) আমার তো মনে হচ্ছে এর পর কৌশিকের থেকেও চূর্ণী ভালো ছবি বানাবে! কোনদিন শুনবো কৌশিকের ছবি গোপনে চূর্ণী বানিয়ে দিয়েছে! (সিরিয়াস হয়ে) তবে বলতেই হয় ও অসম্ভবকে সম্ভব করেছে৷ হয়ত সরাসরি কিছু বলেনি কিন্তু বাক স্বাধীনতা, বেড়াল, সেন্সর বোর্ড, শেষমেষ জাতীয় পুরস্কার- এটাই বলতে ইচ্ছে হয় যে চূর্ণী পারল৷ ওকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা নেই৷ মানুষ তখনই প্রতিবাদ করবে যখন সে অনুভব করবে৷ সেই প্রতিবাদের ভাষাটা তুমি দিয়ে দিলে৷ সব থেকে বড় কথা চূর্ণী ভয় পায়নি৷ যেখানে মুখ বুজে থাকলেই সব ঝামেলা মিটে যায়, সেখানে ওর কী দরকার ছিল এটা বানাবার? বাক-স্বাধীনতার সপক্ষে এত প্রশ্ন তোলার?

প্রশ্ন: একটা সংলাপ আছে কলম আর তরোয়ালের মধ্যে পরেরটাই জিতে যায়৷

তসলিমা: সব ব্যাপারে কলম ধরলে তো মানুষ সভ্যই হত৷ আমি তো দিব্বি কবিতা, প্রেমের গল্প লিখতে পারতাম৷ কিন্তু সমাজের যে অবস্থা ছিল বা ওরা আমাকে যে অবস্থায় পাঠিয়ে দিল তাতে নারীদের জন্য কলম ধরতে বাধ্য হলাম৷ না হলে বাক-স্বাধীনতা, বৈষম্য নিয়ে লেখার কী দরকার ছিল?

চূর্ণী: একটা দৃশ্য আছে- একসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের ছবির পটভূমিকায় প্রশাসনিক প্রহসন চলছে৷ মানে রাজ্যে এরকম সাম্যর ধারা থাকা সত্ত্বেও একজন লেখককে রাজ্য থেকে বেরিয়ে যেতে হল৷ আসলে সিস্টেমটাই প্রস্তুত নয় এরকম একটা সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করার জন্য৷

তসলিমা: ছবিতে দুঃখ-ব্যঙ্গ-হাস্যকর ব্যাপারগুলো একটার সঙ্গে অন্যটা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মিশেছে৷

চূর্ণী: প্রশাসনিক প্রহসনটা ইঁদুর থেকে পাহাড় বানাবার গল্পের মতন৷ যেটার একটা সিম্পল সলিউশান হতে পারে সেটাকেই বিরাটাকার করে ফেলা…

প্রশ্ন: যৌন স্বাধীনতা নিয়েও কথা আছে৷ যেখানে লেখিকা বলে, ‘আই হ্যাভ হ্যাড মাই শেয়ার অফ গুড সেক্স উইথ মেন আই চোজ টু অ্যাকসেপ্ট৷’

তসলিমা: এখানে আমি একটা বলতে চাই৷ আমি কিন্তু চিটিং-য়ের কথা বলিনি৷ আমি স্ট্রিক্টলি মনোগ্যামাস৷ যৌন স্বাধীনতা মানে আমার কাছে, নারীর ‘না’ বলবার স্বাধীনতা৷ কোনও পুরুষ- সে যেই হোক, যদি বলে ‘আই অ্যাম রেডি’, মেয়েটি যেন, তার ইচ্ছে না থাকলে বলতে পারে, ‘আই অ্যাম নট রেডি৷ আমি রেডি নই৷’ সেই ‘না’ করবার স্বাধীনতা৷ আমার ‘দ্বিখণ্ডিত’ নিষিদ্ধ হয়েছিল এই জন্যই৷ প্রথমে বলা হয়েছিল বইটি অশ্লীল৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও যখন নিষিদ্ধ করা গেল না, তখন বলা হল আমি ধর্মে আঘাত দিয়েছি৷ যাঁরা ‘দ্বিখণ্ডিত’ নিষিদ্ধ করেছিলেন তাঁরাই ‘উতলহাওয়া’ বা ‘আমার মেয়েবেলা’ নিষিদ্ধ করেননি, কারণ সেখানে আমি লিখেছিলাম যে যৌনতা উপভোগ করেছি৷

চূর্ণী: বই নিষিদ্ধ করা বা পুড়িয়ে ফেলে কোনও লাভ তো হল না৷ কারণ, পরবর্তীকালে বইটা যখন পাওয়া গেল তখন মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই বইটাই পড়লেন৷ এমন মানুষও পড়েছেন যাঁরা হয়ত আগে ওটা পড়তেন না, যদি না ওটার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেওয়া হত৷ আর এখন তো সোশ্যাল মিডিয়া যেরকম অ্যাক্টিভ কারও লেখাই চেপে রাখা যায় না- সেটা আমরা বুঝে গিয়েছি৷

তসলিমা: হয়তো ৫০০ বছর পর এটা নিয়ে খোলাখুলি কথা হবে৷

চূর্ণী: আসলে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বা সাম্যর পক্ষে নারীর পাশাপাশি পুরুষদেরও আরও ভোকাল হওয়া দরকার৷

তসলিমা: হ্যাঁ, পুরুষ যতদিন পথে না নামবে ততদিন লাভ হবে না৷ আমি সব পুরুষকে অবশ্যই জেনারালাইজ করছি না৷ কিন্তু ওরা তো আগে শুরু করুক, তারপর বাকিরা যুক্ত হবে। এটা তো আসলে ছেলে-মেয়ের ব্যাপার নয়, মানুষের ব্যাপার৷ আর সিস্টেম পেশি দিয়ে চলে না, চলে বুদ্ধি দিয়ে।

সূত্র : ঢাকাটাইমস

আপনার মতামত



close