“নারীকে অর্থনীতির মূলধারায় অধিষ্ঠিত করতে চাই”

টাইগার নিউজ

6666_58128টাইগার নিউজ :: নিজেকে ‘চট্টগ্রামের মেয়ে’ হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য ও গর্ব তার। চট্টগ্রামেই তার জন্ম ও বেড়ে উঠা। বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। বাবার কাছ থেকে ব্যবসায় হাতেখড়ি। তারপর নিজের ব্যবসা, স্বামীর ব্যবসা দেখাশোনা করতে করতে মনোয়ারা হাকিম আলী এখন দেশের প্রতিষ্ঠিত নারী উদ্যোক্তাদের একজন। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রথম সহ-সভাপতি। আসন্ন এফবিসিসিআই নির্বাচনে লড়তে যাচ্ছেন চেম্বার নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা এই নারী। শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয়, জিতে ইতিহাস গড়তে চাইছেন তিনি। এর আগে কখনও এফবিসিসিআইয়ের শীর্ষ পদে কোনো নারীকেই দেখা যায়নি।

নারী হয়ে প্রতিযোগিতায় কীভাবে নিজের শক্ত অবস্থান গড়েছেন সেই কথাই বলছিলেন। নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে গড়ে তুলেছিলেন চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, চিটাগাং উইম্যান এন্টারপ্রিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বেশকিছু ব্যবসায়ী সংগঠন। আগামী দিনেও কাজ করে যেতে চান দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে এগিয়ে নিতে। পুরুষের পাশাপাশি নারী নেতৃত্বকে সামনে এনে উৎসাহিত করতে চান দেশের নারী উদ্যোক্তাদের।

যুক্তরাজ্যের সিটি অব লন্ডন কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলেও মনোয়ারা হাকিম আলী যেন পুরোদস্তুর একজন চট্টগ্রামের মেয়ে। কথায় কথায় ফুটে উঠলো সেই ছবিই। তার সাফল্যে অবাক বনে যাওয়া অন্যদের কথা ধরেই বললেন, ‘ঢাকার মেয়েরা অনেকে গালে হাত দিয়ে ভাবে-ইবা কী হইয়্যে, মনোয়ারা হাকিম ক্যানে পাইজ্যে? ও মারে মা, ইবা ক্যানে আইস্যে এ্যান্ডে। তারা ভাবতেও পারেননি চট্টগ্রাম থেকে উঠে আসা একজন নারী এভাবে নিজেকে মেলে ধরবেন।’

সিআইপি মর্যাদা পাওয়া মনোয়ারা হাকিম আলী ব্যবসায়ী জীবনে জেনেটিকা বাংলাদেশ লিমিটেড, গ্লোবাল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস ও ইন্ট্রাকো (বিডি) লিমিটেডের চেয়ারম্যান। ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইন্ট্রাকো গ্রুপ, হোটেল আগ্রাবাদ, ট্যুরিজম ইন্টারন্যাশনাল, বাটার ফ্লাই পার্ক লিমিডেট, আল-মোস্তফা ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আলট্রা ফার্মা লিমিটেড, ট্র্যাভেল শপ লিমিটেডের। এছাড়া মেট্রিক সেলুলার ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসেস লিমিটেড এবং মদিনা ইনডেন্টিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও তিনি। এছাড়া সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতিসহ বেশ কয়েকটি পেশাগত, সামাজিক বাণিজ্য সংগঠনের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠিত এই নারী। দীর্ঘ কর্মজীবনে সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে ইউনেস্কো অ্যাওয়ার্ড, মাহাত্মা গান্ধী শান্তি পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের প্রায় অর্ধশত সম্মাননাও জমা হয়েছে তার ঝুলিতে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাবিবুল্লাহ ফাহাদ। সঙ্গে ছিলেন সৈয়দ বাকের

ব্যবসায় এলেন কীভাবে?

আমার বাবা ছিলেন একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। মূলত তার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় প্রথম ব্যবসায় হাতেখড়ি। প্রথম জীবনে বাবার প্রতিষ্ঠিত হোটেল পরিচালনায় বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে আমি সম্পৃক্ত হই। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী পরিবারে বিয়ের সুবাদে স্বামীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও উৎসাহে নিজেকে পুরোপুরি ব্যবসায়ে সম্পৃক্ত করি।

শুরুটা কেমন ছিল?

আমাদের সময়ে নারী উদ্যোক্তা কী তা বেশিরভাগ নারীই জানত না। কিন্তু উদ্যোক্তাশীল মনোভাব নিয়ে আমাদের গ্রামাঞ্চলের নারীরা দিন-রাত কাজ করে যেত। ছোট বেলায় বাবার সাথে প্রায়ই গ্রামে যেতাম। যার ফলে গ্রামাঞ্চলের নারীদের উদ্যোক্তাশীল মনোভাব আমার চোখে পড়ত। বিশেষ করে হাস-মুরগি পালন, কৃষি কাজ করা এবং পাশাপাশি এই সমস্ত পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় নারীদেরকে অত্যন্ত দক্ষ হাতে পরিচালনা করতে দেখতাম। গ্রামের নারীদের এই সকল কর্মকা- আমাকে ব্যবসায় সম্পৃক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। আমি সিদ্ধান্ত নেই শহুরে জীবনের প্রেক্ষাপটে আমাকে কিছু একটা করতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই বাবার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ব্যবসায় হাতেখড়ি।

শুরুর দিকের বাধা বিপত্তিগুলো পার হয়েছেন কীভাবে?

আমাদের তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপট কোনোভাবেই নারীদের ব্যবসার অনুকূলে ছিল না। নানা প্রতিবন্ধকতা আমার কর্মক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করত। আমি সবসময় যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তা সফলকাম হওয়ার চেষ্টা করতাম। বিশেষ করে আমার পরিবার আমাকে সব ধরনের সহায়তা ও সমর্থন করত বলে কোনো বাধাই আমার কাছে বাধা মনে হতো না।

তারপর ওখান থেকে বেরিয়ে এলেন কেন?

নিজের ব্যবসার পাশাপাশি যখন অন্য নারীদের দেখতাম তারা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, তখন থেকেই আমার মাথায় ঘুরতে থাকে তাদেরকে কিভাবে সহযোগিতা করা যায়। প্রথমেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমাদেরকে সংগঠিত হতে হবে। সেই ভাবনা থেকে ৯০ দশকের শেষের দিকে চট্টগ্রামের গুটি কয়েক নারী উদ্যোক্তাকে নিয়ে চিটাগাং উইম্যান এন্টারপ্রিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করলাম।

চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন…

আঞ্চলিক বাণিজ্য সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি মনে করলাম। সেই তাগিদ থেকে চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা গ্রহণ করি। ২০০৩ সালে এই চেম্বার পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা পায় এবং প্রায় ছয় বছর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।

এতে কী ধরনের সুফল পেলেন?

পূর্ণাঙ্গভাবে নারী উদ্যোক্তাদের বাণিজ্য সংগঠন প্রতিষ্ঠার ফলে আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করার সুযোগ পাই এবং এই সকল সম্ভাবনা ও সমস্যা সমাধানে নিজেরা পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করি এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে আমাদের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এভাবেই চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সৃষ্টির মাধ্যমে চট্টগ্রাম অঞ্চলের নারী উদ্যোক্তারা নানা ধরনের সুফল পেতে থাকে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতির জন্য এই চেম্বার থেকে আপনারা কী ধরনের কাজ করেন?

নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক উন্নয়নে কাজ করাই চিটাগাং উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মূল লক্ষ্য। বড় ব্যবসায়ীদের সাথে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সংযোগ স্থাপন, ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় মূলধনের জোগান, উৎপাদিত পণ্যের প্রচার-প্রসারসহ সব ধরনের ব্যবসায়িক উন্নয়নমূলক কাজ আমারা করে থাকি। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে সহযোগিতা করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা এই চেম্বার ধারাবাহিক ভাবে আয়োজন করে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের একমাত্র নারী উদ্যোক্তাদের মেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সাথে আপনার পথচলা কতদিনের?

আমি প্রায় ২০ বছর যাবৎ ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে আমি একদম তৃণমূল থেকে ব্যবসায়ী সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের কর্মকা-ে জড়িত হই। বিগত ৫ বছর ধরে এফবিসিসিআইয়ের সাথে আমি সরাসরি সম্পৃক্ত।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি হতে চাইছেন কেন?

যেকোনো কাজের সফল সমাপ্তির জন্য ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমি যে লক্ষ্য নিয়ে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কাজ শুরু করেছিলাম সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমাকে এফবিসিসিআইয়ের শীর্ষ নেতৃত্বে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করি। যেই লক্ষ্য নিয়ে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর এদেশের ব্যবসায়ী ও নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে কাজ শুরু করেছিলাম সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি নির্বাচিত হলে কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে মনে করছেন?

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি নির্বাচিত হলে পুরুষদের পাশাপাশি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল ধারায় নারীদের সম্পৃক্ত করতে চাই। জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশে যেখানে অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী সেখানে যদি ব্যবসা-বাণ্যিজের মূল ধারায় নারীদের সম্পৃক্ততা না থাকে তাহলে এদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক বিকাশ সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করে পুরুষদের পাশাপাশি কাজ করার ক্ষেত্র তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে সকলের অংশগ্রহণে একটি পরিবেশ তৈরি হবে। যার মাধ্যমে আমাদের বিকাশমান অর্থনীতিকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি বর্তমানে চলমান ব্যবসায়িক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং তৃণমূল থেকে বৃহত্তর পরিসরে ব্যবসায়ীদের সকল ধরনের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ সঠিকভাবে সংরক্ষণের মাধ্যমে ব্যবসায়ী সমাজের উন্নয়নে কাজ করে যেতে চাই।

দেশের বর্তমান ব্যবসায়িক অঙ্গন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কতটুকু অনুকূল বলে মনে করেন?

অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে নারীদের জন্য সবচেয়ে বেশি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে আমি মনে করি। এর জন্য সকল কৃতিত্ব আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিতে চাই। তিনি এবং তাঁর সরকারের নারী উদ্যোক্তাবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির ফলে আজ আমাদের দেশের নারী উদ্যোক্তা অনেক পথ এগিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিবছর বাজেট ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ এদেশের নারী উদ্যোক্তাদের স্বীকৃতি ও সম্মানিত করেছে।

নারীদের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য কতটা উপযোগী?

আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের জন্য ব্যবসা অত্যন্ত উপযোগী। ঘরকন্নার কাজের পাশাপাশি নারীরা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। এছাড়া সরকারের নারী উদ্যোক্তাবান্ধব নীতির ফলে সরকারি-বেসরকারি সকল সংস্থা বর্তমানে নারী উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে। যার ফলে বর্তমানে দেশে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে বলে আমি মনে করি।

ব্যবসা ও সংগঠন একসঙ্গে দুটো সামলানো তো কঠিন…

ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বামী, সন্তান সামলিয়ে আমাকে সংগঠনগুলোতে প্রচুর সময় দিতে হয়েছে। যদিও এটা আমার জন্য কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি করেছে। যেহেতু আমি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এই ধরনের কর্মকা-ে সম্পৃক্ত হয়েছি সেই জন্য সব ধরনের অবস্থা মানিয়ে নিয়ে আমার কর্মকা- পরিচালনার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।

এবার যদি ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন…

বিগত ৫ বছরে দুবার সরাসরি চেম্বার গ্রুপ থেকে নির্বাচন করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আমি এখানে এসেছি। এবারও আমি আশা করি, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আমি এফবিসিসিআইয়ের সভাপতির পদে আসীন হতে পারবো এবং বাংলাদেশের চেম্বার তথা সকল বাণিজ্য সংগঠন ও ব্যবসায়ী সমাজের স্বার্থ সংরক্ষণে দৃঢ়তার সাথে কাজ করে যেতে পারবো।

নির্বাচিত হলে কোন কাজগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেবেন?

ব্যবসায়ীদের উন্নয়ন ও স্বার্থ-সংরক্ষণে সব ধরনের কর্মকা-ই আমার কাছে প্রাধান্য পাবে। যার মাধ্যমে দেশের বিকাশমান অর্থনীতিকে সমৃদ্ধশীল করে গড়ে তুলতে পারবো।

সেই প্রক্রিয়াটা কী হবে?

আমি বিশ্বাস করি ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট। বাংলাদেশ প্রচুর পণ্য, প্রচুর সম্ভাবনাময় দেশ। প্রতিটি জেলার ঐতিহ্য ও প্রসিদ্ধ পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করবো। যেমন রাজশাহীর সিল্ক, পার্বত্য-চট্টগ্রামের পাহাড়ি তাঁত বস্ত্র, টাঙ্গাইলের প্রসিদ্ধ টাঙ্গাইল শাড়ি, ঢাকাই জামদানি এইভাবে প্রতিটি জেলার নিজস্ব পণ্যের বিকাশ ও উন্নয়নে পরিকল্পিতভাবে কাজ করে যাবো। পাশাপাশি পর্যটন ও আইটি খাতকে সমান গুরুত্ব দেবো। এছাড়াও ইতিমধ্যে আমি দেখেছি আমাদের দেশের অনেক জেলা এখনও অনেক অনুন্নত রয়েছে। সে সব জেলার পণ্য নির্বাচন করে নির্বাচিত পণ্যের উন্নয়নে কাজ করে যাবো।

ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে আনার দাবি…

ব্যবসা পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের আশপাশের দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংকঋণের সুদের হার অনেক বেশি। গত নির্বাচনেও আমাদের ইস্তেহারে ছিল সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট-এ নিয়ে আসা। আমাদের বর্তমান সভাপতি এই নিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে আমি নির্বাচিত হলে এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবো।

দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ জোগাতে কী করবেন?

বাংলাদেশের মতো জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই শিল্পের বিকাশে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের কর্মকা- অব্যাহত আছে। আমি নির্বাচিত হলে সরকারের সকল মহলের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সমস্ত কর্মকা-ের সঠিক বাস্তবায়ন ও উদ্যোগ গ্রহণ করবো।

রপ্তানি খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। এই খাতের উন্নয়নে আপনার পরিকল্পনা কী?

আমাদের রপ্তানি খাত অনেক বড় হচ্ছে। নতুন নতুন পণ্য আসছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও চাচ্ছেন রপ্তানি বাড়ানোর জন্য। এই পণ্যগুলোকে বাজারজাত করার জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায় তা নিয়ে কাজ করবো। আমরা পোশাক শিল্পের প্রতি বেশি নির্ভরশীল হয়ে গেছি। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অন্য খাতগুলোকেও রপ্তানিতে এগিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করবো।

অন্য খাতের মধ্যে কোনগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে?

আমি আগেই বলেছি বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার একটি দেশ। এখানে পর্যটন শিল্পের বিকাশের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ইত্যাদি খাত এগিয়ে নেওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমি মনে করি।

বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা বারবার বলছেন…

বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদেরকে কিছুটা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এ বিষয়ে বিরোধী দল এবং সরকার উভয়কেই আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যবসায়ের অর্থনীতি বিকল হয়ে গেলে রাজনীতি করার আর কোনো ক্ষেত্র থাকবে না। আমি সকল মহল বিশেষ করে বিরোধী দলের প্রতি আহবান জানাই, সহিংসতার পথ পরিহার করে স্থিতিশীল ও অহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের পরিবেশ অবিলম্বে ফিরিয়ে আনুন। তা না হলে আমাদেরকে ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে।

গত কয়েক মাসে বিদেশি বিনিয়োগ খুব বেশি আসেনি বলে শোনা যাচ্ছে…

আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে অত্যন্ত ভালো। রাজনৈতিক এই পরিস্থিতির মধ্যেও বিগত সময়ে বিপুল সংখ্যক বিদেশি বিনিয়োগকারী আমাদের দেশে এসেছেন। সবাই বুঝতে পারছেন এই পরিস্থিতি সাময়িক। সুতরাং এটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীরা কী ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছে?

ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের নিকট থেকে সব ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারপ্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রতিনিয়ত সরাসরি ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন। আমরাও ব্যবসায়ীদের যেকোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাচ্ছি। তাছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা দেশের ব্যবসায়ীদের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

একজন পরিচালক হিসেবে পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আপনার পরামর্শ…

বর্তমানে পুঁজিবাজার অনেকটাই স্থিতিশীল রয়েছে। আশা করি এ অবস্থা চলমান থাকবে। বিনিয়োগে কিছুটা ঝুঁকি তো থাকবেই। তারপরও সতর্কতার সাথে বিনিয়োগে সবার প্রতি আমার পরামর্শ থাকলো।

নারীরা ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় ব্যবসায়ী নারী নেতৃত্বে আসছে না…। এফবিসিসিআইয়ে নারী নেতৃত্ব বাড়াতে কী করবেন?

এক সময়ে নারীরা ব্যবসাই করত না। এখন উল্লেখযোগ্যহারে নারীরা ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পৃক্ত হচ্ছে। আগামীতে নারীরা ব্যবসায়ীদের নেতৃত্বে আসবে। এটা সময়ের ব্যাপার। তারপরও আমরা নারী নেতৃত্ব বিকাশে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।

অ্যাসোসিয়েশনগুলোতেও তো নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে না…

আমি আগেই বলেছি একসময়ে নারীরা ব্যবসায় সম্পৃক্ত ছিল না। বর্তমানে প্রতিদিন নারী ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সময়ে অ্যাসোসিয়েশনে নারীরা নেতৃত্বে এগিয়ে আসবে।

এক্ষেত্রে কমিটিতে পদ সংরক্ষণের কোটা ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন?

কোটা রাখা ভালো। তবে আমি এটা বিশ্বাস করি না। কারণ আমি যেভাবে নির্বাচিত হয়ে এসেছি তাতে পুরুষের সঙ্গে সমানভাবে লড়তে হয়েছে। সারা দেশের চেম্বারগুলো ঘুরতে হয়েছে। এতে শক্ত একটা অবস্থান গড়ে ওঠে। কিন্তু দেখা যাবে, যারা কোটার মাধ্যমে আসছেন তাদের গুরুত্ব থাকবে না। তবে নারীদের উৎসাহিত করতে কোটা রাখা যায়।

আপনার এই সাফল্যকে অন্যরা কীভাবে দেখছেন?

ঢাকার অনেকে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন। তারা বলেন, ইবা কী হইয়্যে, মনোয়ারা হাকিম্মা ক্যানে পাইজ্যে? ও মারে মা, ইবা ক্যানে আইস্যে এ্যান্ডে। ঢাকার অনেক নারী উদ্যোক্তা চিন্তাও করেননি যে, আমি এখানে আসতে পারবো। চট্টগ্রামের মানুষ ব্যবসানির্ভর। ক্লাবনির্ভর নয়। যে কারণে আমরা ব্যবসা বেশি বুঝি।

ব্যবসায়ী হিসেবে সামাজিক দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে পারেন?

ব্যবসা পরিচালনাও একটি সামাজিক কাজ বলে আমি মনে করি। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদিকে যেমন অর্থনীতির উন্নয়ন হচ্ছে অন্যদিকে বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়াও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সিএসআর কর্মকা-ের মাধ্যমে আমরা সামাজিক কর্মকা- পরিচালনা করে থাকি।

নির্বাচিত হতে পারলে সামাজিক দায়িত্বশীলতার জায়গায় থেকে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কতটুকু সম্ভব হবে?

সামাজিক কর্মকা- আমার দৈনন্দিন কাজের একটি অংশ। শত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে আমি আমার সামাজিক কর্মকা- অব্যাহত রাখবো। এছাড়াও আপনি জেনে খুশি হবেন, এফবিসিসিআইয়ের ইতিহাসে প্রথম আমরা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারের সাথে যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। যার বিস্তৃতি ৬৪টি জেলাব্যাপী। এই কর্মসূচির মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ, ই-কমার্স সেন্টার স্থাপন ও পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে এই কর্মকা- অব্যাহত থাকবে এবং আরো নতুন কর্মসূচি আমরা হাতে নেব।

সূত্র : ঢাকাটাইমস

আপনার মতামত



close